Home / সম্পাদকীয় / কবি ও কলামিষ্ট / বাংলা বানানে আমাদের সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত

বাংলা বানানে আমাদের সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত

আমরা জাতিতে বাঙালি হলেও বিদেশী ভাষার প্রতি আমাদের আগ্রহ বেশী। কেননা শুধু বাংলা শিখে স্কুল মাস্টারের চাইতে ভাল চাকুরি পাওয়ার সম্ভাবনা কম। ইংরেজী শিখলে তথ্যপ্রযুক্তি, ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া যেমন সহজ হয় তেমনি বিশ্বের যেকোন দেশে গিয়ে লেখাপড়া করাও সহজ হয়। পাশাপাশি ভাল বেতনও পাওয়া যায়। তাই বলে মাতৃভাষাকে অবহেলা করা যাবে না। মাতৃভাষা ও মাতৃভূমিকে ভালবাসার মধ্যে একজন প্রকৃত দেশ প্রেমিকের পরিচয় পাওয়া যায় নতুবা সে পশুতুল্য। কবি গুরু বলেন “কোন শিক্ষাকে স্থায়ী করতে হলে তাকে চিরাচরিত মাতৃভাষায় বিগলিত করে দিতে হবে”। তাই মাতৃভাষাকে ভালবাসার সাথে সাথে বানানের প্রতি খুবই সতর্ক থাকতে হবে। আমাদের বানান অশুদ্ধির প্রধান কারণ হলো আমরা মুখে যেভাবে শব্দাবলি উচ্চারণ করে থাকি ঠিক সেভাবেই লিখে থাকি। কবি গুরু ১৯২৩ সালে বাংলা বানানকে কিছুটা সরল করেন। তিনিই প্রথম বাঙলাকে করলেন বাংলা। তার পর ১৯৩৪ ও ১৯৩৬ সালে বাঙলা বানান সংস্কার করলেন কলকাতায়। ‘বাংলা একাডেমী’ একই কাজে হাত দিলেন। প্রণীত হল প্রমিত বাংলা বানান নিয়ম ১৯৯২। আবার ১৯৫৭ সালের “সংসদ বাঙলা অভিধান” এর বানান পরিবর্তন করে ২০০০ সালে ‘সংসদ বাংলা অভিধান’ নামে পরিচয় করা হয়।

অভিধানে, পত্র-পত্রিকায়, দোকানের সাইনবোর্ডে, টেলিভিশনে, হাসপাতালে, ব্যবসায়িক বিজ্ঞাপনে, রাস্তা-ঘাটে অসংখ্য ভুল বানান দেখা যায়। দীর্ঘদিন ভুল বানান যেমন আমরা লিখে থাকি তেমনি বিজ্ঞজনেরাও লিখে থাকেন। যেমন আমরা বলি ইংরেজি সন, বাংলা সন ও আরবি সন, তা ঠিক নয়। হবে খ্রিস্টাব্দে, সাল ও হিজরি। বাংলা শব্দ প্রতিদিনই আমরা ভুল বানানে দেখছি ও লিখছি। সে সব শব্দের শুদ্ধ বানান কি হবে, তা সতর্কতার সাথে দেখব। যেমন-
(১) অ্যাকাডেমিঃ- সর্ষেতে ঝাড় ফুঁক দিয়ে ভূত ছাড়াতে হয়। ওঝা যদি এসেই দেখে সর্ষেতেই ভূতের বাসা, তাহলে তিনি ভূত ছাড়াবেন কোন আশায়? অ্যাকাডেমি সৃষ্টি থেকেই ভুল বানানে লেখা হচ্ছে ‘একাডেমী’ । শব্দ একটি এতে বানান ভুল দুটি। শব্দটির প্রথমে ‘অ্যা’ হবে। আর যেহেতু বিদেশী শব্দে ‘ ী – কার ব্যবহারের বিধান নেই, সেহেতু শব্দটির শেষে কেবলই – ি কার হবে। অতএব শব্দটির শুদ্ধ বানান হবে ‘অ্যাকাডেমি’।
(২)অ্যাডভোকেট – কোন কোন ইংরেজি শব্দের প্রথমে ‘ অ ’ -এর ডানে যা ( য-ফলা আকার) যুক্ত হয়ে ‘ অ্যা ’ হয়। কখনো ‘এ’ -র ডানে ‘্যা’ যুক্ত হয়। এ নিয়ম জেনেও অনেকে তা পালন করছেন না। এ নিয়মই লিখতে হবে, অ্যাডভোকেট, অ্যাডমিরাল, অ্যাভিনিউ, অ্যাডজুট্যান্ট, অ্যাকসান, অ্যাম্বুলেন্স, অ্যাসিড ইত্যাদি। কিন্তু পরিতাপের বিষয় সরকারি ও বেসরকারি জরুরি রোগী বহনকারী গাড়িতে এ্যাম্বুলেন্স বা এম্বুল্যান্স লেখা, তা কবে শোধরাবে?
(৩) শ্রদ্ধাঞ্জলি – ২১ শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ও শহিদ দিবস , ১৭ মার্চ জাতীয় শিশু দিবস ইত্যাদি দিবসে দেখা যায় ‘শ্রদ্ধাঞ্জলী’ লেখা হচ্ছে। এই শব্দটির শুদ্ধ রূপ হবে ‘শ্রদ্ধাঞ্জলি’। আমরা শ্রদ্ধঞ্জলি লিখবো বা দিব।
(৪) লাইব্রেরি – লাইব্রেরি হল যেখানে কেবল পড়ার জন্যে বই সংগ্রহ করে রাখা হয়। কিন্তু বিক্রয়ের জন্য নয়। তারপরও বড় বড় শহর থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যন্ত অসংখ্য দোকান আছে আর সেখানে ‘লাইব্রেরী’ লেখা আছে। বিভিন্ন সাইনবোর্ডে দেখা যায় ল্যাবরেটরী, প্রিপারেটরী, ডিগ্রী, ফার্মেসী, স্যানিটারী, কনফেক্শনারী ইত্যাদি। এ সবই ভুল বানান। নিয়ম হচ্ছে যে, বিদেশী শব্দে কখনও ঈ বা ী – কার হবেনা। ই বা ি – কার হবে, তাহলে বানান শুদ্ধ হবে। যেমন প্রাইমারি, ডিগ্রি, ফার্মেসি, ল্যাবরেটরি, প্রিপারেটরি, জুয়েলারি, লাইব্রেরি, কনফেকশনারি ইত্যাদি।
(৫) বিদেশি শব্দে ‘ছ’ ‘ঞ’ ‘য’ ও ৎ ব্যবহার করা যায়না। তাই শুদ্ধ বানান – এ লিখতে হবে সালাম, সালমা, সাবিনা, সেনচুরি, মনজুর, নামাজ, ইবাদত, হেদায়েত, লুতফর, ঈদুল-ফিতর ইত্যাদি।
(৬) মো. বা ডা. পূর্ণনাম মোহাম্মদ বা ডাক্তার কে আমরা সংক্ষেপে লিখতে হলে সংক্ষেপন চিহ্ন(.) ব্যবহার করতে হবে। যেমন – মোহাম্মদ কে মো. বা ডাক্তারকে ডা. লিখতে হবে।
নিয়ম হল বাংলা বা ইংরেজি শব্দকে সংক্ষেপে লিখতে হলে সংক্ষেপন চিহ্ন ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু আমরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বিভিন্ন অফিস- আদালতে ভুল বানান লিখছি। যেমন- মোঃ, ডাঃ, মুঃ । প্রকৃত পক্ষে এ চিহ্ন হল বিসর্গ (ঃ) উচ্চারণ হবে মোহ্ , ডাহ্ , মুহ। সুতরাং এখন থেকে সংক্ষেপন চিহ্ন ব্যবহার করব।
(৭) মাস্টার বিদেশি ইংরেজি শব্দের বানানে ‘শ’ বা ‘ষ’ হবেনা। এ ক্ষেত্রে ‘স’ হবে। তাই মাস্টার, ডাস্টাার, পোস্টার, পোস্ট অফিস, ডাস্টবিন লিখবো। কিন্তুু বিভিন্ন সাইনবোর্ডে দেখা যায় মাষ্টার বীজ, মাষ্টার ভিলা, পোষ্ট অফিস, ডাষ্টবিন, তা পরিহার করতে হবে।
(৮) সব নারী বাচক শব্দের শেষে ‘ ী ’ হবে। যেমন নানী, দাদী , বুড়ী, রূপবতী, শ্রীমতী, শাশুড়ী, সতী ইত্যাদি।
(৯) সব জাতিবাচক শব্দের শেষে ী – কার হবে। যেমন- বাংলাদেশী , জাপানী, ইরানী, ইরাকী, তুর্কী, ভারতী, সুদানী ইত্যাদি।
(১০) সব বিশেষন বাচক শব্দের শেষে ‘ ী’ হবে। যেমন – সরকারী,দরকারী, জরুরী, আইনী ইত্যাদি।
(১১) সব পেশা বাচক শব্দের শেষে ‘ ী’ হবে। যেমন – চাষী , দোকানী, মালী, জুয়ারী, তাতী ইত্যাদি।
(১২) ইংরেজী বা যেকোন বিদেশী শব্দের বাংলা বানানে কখনো ‘ ণ’ বসেনা। সব সময় ‘ন’ হবে। যেমন – গভর্নর , ফাউন্ডেশন, কর্নওয়ালিশ, লন্ডন প্রভৃতি।
(১৩) দীর্ঘ উচ্চারণ বিশিষ্ট বিদেশী শব্দে ‘ ী’ – কার ব্যবহার করা যায়। যেমন- ডীন, গ্রীক, ডিগ্রী ইত্যাদি।
(১৪) ইংরেজি প বা পব বাংলা উচ্চারণ ‘স’ হবে। যেমন- ঢ়ড়ষরপব (পুলিস), ড়ভভরপব (অফিস) হড়ঃরপব (নোটিস) । তবে বাংলাদেশ পুলিশ লিখতে হবে। কারণ এটা সরকারী প্রতিষ্ঠান যেভাবে লিখা আছে সেভাবে লিখতে হবে। যদিও বানান ভূল ।
(১৪) বাংলা একাডেমীর তথাকথিত প্রমিত বানান রীতিতে বলা হয়েছে অসংস্কৃত শব্দে ‘ ী’ এর পরিবতের্ ‘ ি ’ ব্যবহার চলবে। আবার সব অসংস্কৃত শব্দে ‘ ি ’ ব্যবহার করা যায় না। যেমন –
(ক) সাংবিধানিক শব্দে ঃ ইসলামী ফাউন্ডেশন, ফেনী, নোয়াখালী, সরকারী কলেজ, একাডেমী ইত্যাদি।
(খ) ট্রেডমার্ক বা রেজিস্ট্রিকৃত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে । যেমন সোনালী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, প্রাইমারী স্কুল, কারিগরী স্কুল ও কলেজ ইত্যাদি।
(গ) কবি-সাহিত্যিকদের, বিজ্ঞানীদের নাম পরিবর্তন করা যাবে না, যেমন- কাজী নজরুল ইসলাম, জসীম উদ্দীন, সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহ, সৈয়দ আলী আহসান ইত্যাদি।
(ঘ) সাংবিধানিক শব্দের ক্ষেত্রে। যেমন- বাংলাদেশ নির্বাহী, ইংরেজী, রাজধানী, বাংলাদেশী, দাবী, সরকারী, বেসরকারী, ফৌজদারী, বেআইনী, ইসলামী, আদেশাবলী, উত্তরাধিকারী, দোষী, সুপ্রীম কোর্ট ইত্যাদি।
(ঙ)প্রতিষ্ঠান বা বহুল পরিচিত প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের ক্ষেত্রে । যেমন আওয়ামী লীগ, মুসলিম লীগ, ভাষাভাষী, আদিবাসী, নামাজ , রোজা, ওজু, ওজর, আজান ইত্যাদি।
(চ) উদ্ধৃতির ক্ষেত্রে – এ ক্ষেত্রে সরকার বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান লিখিত ঘোষনা দিয়ে নামের পরিবর্তন করতে পারবে। সে ক্ষেত্রে সকলকে অবশ্যই ঘোষণা মেনে চলতে হবে। আবার রাজার নির্দেশে একদিনেই পরিবর্তিত করতে পারে ।
পরিশেষে আমার অনুরোধ আমরা যারা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করছি আমাদের উচিত আমরা নিজেরা এ ভুলগুলো সংশোধনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের শিক্ষার্থীদের কাছে সঠিক শিক্ষা পৌছে দেয়া।
গ্রন্থপঞ্জিকাঃ-
বাংলা একাডেমী প্রমিত বাংলা বানান নিয়ম।
বাংলা ভাষা পরিক্রমা – এম.এম.জাকির হোসেন।
ভাষা শিক্ষা – ড. হায়াত মাহমুদ।
ব্যবহারিক বাংলা অভিধান – বাংলা একাডেমী।
সংসদ বাংলা অভিধান-বাংলা একাডেমী
ভাষা শেলী – রকিবুল হাসান।

Check Also

মুক্তির মিছিলে

মোহাম্মদ শাহজাহান: চির তারুন্যে সমুজ্জল, সায়্যিদউল্লাহ খাঁন, যার মধ্যে ছিল রূপ, রস, সৌরভের হাতছানি। যিনি ছিলেন ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *