Home / ইসলামী জীবন / ইসলাম বিনষ্টকারী দশটি বিষয়, ঈমান নষ্ট হওয়া কয়েকটি আমল , ঈমান সুদৃঢ় রাখার কিছু উপায় এবং দুর্বল ঈমানের কিছু লক্ষন হল
মুহাম্মদ শাহ জাহান শিক্ষক আধুনগর ইসলামিয়া ফাযিল মাদরাসা লোহাগাড়া ,চট্টগ্রাম

ইসলাম বিনষ্টকারী দশটি বিষয়, ঈমান নষ্ট হওয়া কয়েকটি আমল , ঈমান সুদৃঢ় রাখার কিছু উপায় এবং দুর্বল ঈমানের কিছু লক্ষন হল

১ । ইসলাম বিনষ্টকারী দশটি বিষয়
১৷ আল্লাহর ইবাদতে কোন কিছুকে শরীক করা:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করা ক্ষমা করেন না, তা ব্যতীত অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন৷” সূরা আন-নিসা: ৪৮
মৃত ব্যক্তির নিকট প্রার্থনা, ফরিয়াদ এবং মৃত ব্যক্তির নামে মানত ও জবেহ করা শিরকের অন্তর্ভুক্ত ৷

২৷ যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর মাঝে অন্যদেরকে মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করে ও তাদের কাছে প্রার্থনা জানায়, তাদের নিকট সুপারিশ কামনা করে এবং তাদের উপর ভরসা করে, সে আলেমদের সর্বসম্মতিক্রমে কাফের ৷
৩৷ মুশরিকদেরকে অমুসলিম ও কাফের বলে বিশ্বাস না করা বা তাদের কুফরীতে সন্দেহ পোষণ করা অথবা তাদের ধর্মমতকে সঠিক বলে মন্তব্য করা ৷
৪৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনীত ত্বরীকার চেয়ে অন্য ত্বরীকা কে পরিপূর্ণ বলে বিশ্বাস করা অথবা নবীর আনীত বিধান থেকে অন্য বিধানই উত্তম বলে মনে করা৷ এরূপ আকীদা পোষন কারী ব্যক্তি শরীয়তের দৃষ্টিতে কাফের বলে বিবেচিত৷ যেমন কোন ব্যক্তি তাঁর আনীত বিধানের উপর তাগুতের (মানব রচিত) বিধানকে অগ্রাধিকার দিল, এবং কোরআন-হাদীসের সিদ্ধান্ত বাদ দিয়ে -বৈধ জ্ঞানকরে- মানব রচিত বিধানে বিচার-শাসন করল ৷
৫৷ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদর্শিত কোন বিধানের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা যদিও উক্ত বিধানের উপর আমল করা হয়৷ যদি কোন মুসলিম এরূপ করে তাহলে সে শরীয়তের সিদ্ধান্ত মোতাবেক কাফের বলে বিবেচিত হবে ৷
কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন:
“এটি এ জন্য যে, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তারা তা অপছন্দ করে, সুতরাং আল্লাহ তাদের কর্মসমূহকে নিষ্ফল করে দেবেন”৷ সূরা মুহাম্মাদ: ৯
৬৷ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত কোন সামান্য বিষয় অথবা এর সওয়াব-প্রতিদান বা শাস্তির বিধানের প্রতি কোনরূপ ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা কুফরী ৷
কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন:
“বল! তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর নিদর্শন ও তাঁর রাসূলকে বিদ্রূপ করছিলে? তোমরা আর অজুহাত দাড় করো না, তোমরা তো ঈমান আনার পর কুফরী করেছ৷” সূরা আত-তাওবা: ৬৫-৬৬
৭৷ যাদু করা ও যাদুর প্রতি আকৃষ্ট হওয়া, সুতরাং যে যাদু করল অথবা যাদুর প্রতি সন্তুষ্ট থাকল সে কুফরী করল ৷
কেননা আল্লাহ তাআল বলেন:
“তারা কাউকে (যাদু) শিক্ষা দিত না এ কথা না বলে যে, আমরা পরীক্ষা স্বরূপ; সুতরাং তুমি কুফরী কর না৷” সূরা আল-বাকারা : ১০২
৮৷ মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাবত: অমুসলিম তথা ইহুদি, খ্রিস্টান বা মুশরিক প্রমূখদের সাহায্য করা৷
কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন:
“তোমাদের মধ্যে কেউ তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করলে সে তাদেরই একজন হবে, নিশ্চয় আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে সত্পথে পরিচালিত করেন না”৷ সূরা আল-মায়িদাহ: ৫১
৯৷ যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে যে, কিছু লোক আছেন যাদের জন্যে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরীয়ত থেকে বের হয়ে যাওয়ার অনুমতি আছে৷ এরূপ বিশ্বাস পোষন কারী ব্যক্তি শরীয়তের বিবেচনায় কাফের বলে বিবেচিত হবে৷
কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন:
“কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন দ্বীন বা ধর্ম গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনও কবুল হবে না এবং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত”৷ সূরা আলে ইমরান: ৮৫
১০৷ আল্লাহ প্রদত্ত দ্বীন, ইসলামকে উপেক্ষা করে চলা৷ এর বিধি বিধান সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন ও সে অনুযায়ী আমল না করা ৷
কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন:
“যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের নিদর্শনাবলী দ্বারা উপদিষ্ট হয়ে তা হতে মুখ ফিরিয়ে নেয় সে অপেক্ষা অধিক যালিম আর কে? আমি অবশ্যই অপরাধীদের শাস্তি দিয়ে থাকি”৷ সূরা আস সিজদা: ২২
উল্লেখিত ইসলাম বিনষ্টকারী বিষয় সমূহে স্বেচ্ছায় জড়িত হওয়া আর ঠাট্টা-বিদ্রূপ কিংবা ভয়ভীতির করণে জড়িত হওয়ার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই৷ অবশ্য কেহ জোরপূর্বক বাধ্য করলে অন্য কথা৷ ক্ষতির দিক থেকে আলোচিত কারণগুলোর প্রত্যেকটিই খুবই ভয়াবহ ও মারাত্মক৷ আর বিষয়গুলো অনেক মুসলিমের জীবনে অহ-রহ সংঘটিত হয়ে থাকে৷ অতএব প্রতিটি মুসলমানের উচিত এ বিষয়গুলো থেকে নিজেকে দূরে রাখা ও সতর্ক থাকা ৷
২ । ঈমান নষ্ট হওয়া কয়েকটি আমল
একত্ববাদবিরোধী-আল্লাহ দ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করে। এ জন্য শিরক-বিদায়াত সম্পর্কে আমাদেমানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমল। আমল ভালো হলে জীবন ধন্য, আর আমল খারাপ হলে জীবন বরবাদ হয়ে যায়। খারাপ আমল করে পৃথিবীতে সাময়িক লাভবান বা আনন্দ পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু ভালো আমলে পৃথিবী ও আখেরাতের মঙ্গল নিহিত। কোনোক্রমেই অতিরিক্ত বা অন্য কোনো কর্ম করার সুযোগ ইসলামে নেই। নিম্নে এমন কিছু আমল নিয়ে আলোচনা করতে চাই, যা করলে ঈমান ধ্বংস হয়ে যাবে।
১. গায়রুল্লাহর কাছে দোয়া করা : পবিত্র কুরআনে আছে, ‘আর তাঁকে ছেড়ে এমন কাউকে ডেক না, যে না তোমার উপকার করতে পারে, আর না কোনো তি করতে পারে। আর যদি তা করো তবে অবশ্যই তুমি জালেমদের (মুশরিকদের) অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে’। (সূরা ইউনুস-১০৬)
রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহকে বাদ দিয়ে তার কোনো সমককে ডাকা অবস্থায় মারা যাবে তাহলে সে (জাহান্নামের) আগুনে প্রবেশ করবে। (বুখারি)
২. গায়রুল্লাহর নামে জবেহ করা : পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তুমি তোমার রবের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করো ও জবাই করো। (সূরা কাওছার-২)
রাসূলুল্লাহ (দ.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি গায়রুল্লাহর নামে জবাই করে, আল্লাহ তার ওপর লানত করেন’। (মুসলিম)
৩. . গায়রুল্লাহরনজর-নেয়াজ করা : নৈকট্য হাসিল ও ইবাদতের নিয়তে কোনো সৃষ্টিকে নজর-নেয়াজ দেয়ার রেওয়াজ আমাদের সমাজে দেখতে পাওয়া যায়। অনেকে সন্তান কামনায় মাজারে গিয়ে থাকে। মৃত ব্যক্তির কাছে প্রার্থনা করে। এটা তাওহীদের পরিপন্থী এবং স্পষ্ট শিরক।
৪. কবরের চার পাশে তওয়াফ করা : নৈকট্য হাসিল বা ইবাদতের নিয়তে কবরের চার পাশে তওয়াফ করা যাবে না। কারণ তাওয়াফ কেবল কাবা শরিফের সাথেই নির্দিষ্ট। বান্দার উপাসনা বা দাসত্ব একমাত্র আল্লাহর জন্য। সালাত, সিয়াম, জিকির, সাহায্য কামনা, সন্তান ও রোগমুক্তি কামনা, মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করা, অকল্যাণ দূর করার জন্য দোয়া একমাত্র আল্লাহর কাছে করা যাবে। কবরবাসীর কবর তওয়াফ করে তার মাধ্যমে নিজের বাসনা পূরণের কাকুতি শিরকের অন্তর্ভুক্ত।
৫. গায়রুল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করা : আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো ওপর কোনো ব্যাপারে নির্ভরতা ও ভরসা করা যাবে না। সব কাজের সাহায্যদাতা একমাত্র আল্লাহ। আল্লাহ তায়ালা ভরসাকারীদের জিম্মাদার হয়ে যান।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তাঁর ইবাদত করো এবং তাঁর ওপর ভরসা করো’। (সূরা হূদ-১২৩)
৬. ইসলাম প্রতিষ্ঠিত কোনো বিষয়কে অপছন্দ করা : পবিত্র ইসলাম ধর্মের কোনো রীতি-নীতি, ইবাদত, সিদ্ধান্ত প্রভৃতিকে অপছন্দ করা যাবে না। পবিত্র কুরআন ও হাদিসের ফয়সালা ও সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা যাবে না। আল্লাহ কর্তৃক পরিপূর্ণ হিসেবে ঘোষিত ইসলামে সব বিষয়ের ফয়সালা রয়েছে। । এমন কিছু করা হলে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাদের সব আমল বিনষ্ট করে দেবেন।
৭. ইসলামের হুকুম-আহকাম নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রƒপ করা : পবিত্র কুরআন ও সহি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত ইসলামের কোনো হুকুম-আহকাম নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রƒপ করা ঈমানদারের কাজ নয়। অনুরূপভাবে আল্লাহ, তাঁর রাসূল সা: ও পবিত্র কুরআন সম্পর্কে ভিন্নমত পোষণ, বিরোধিতা করা, হাসি-ঠাট্টা করা যাবে না। এসব কিছু কুফরি কালাম। আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল সা: ও কুরআন কারিমের সাথে হাসি-তামাশা করার এখতিয়ার কাউকে দেয়া হয়নি।
৮. আল্লাহর সুন্দর সুন্দর নাম ও সিফাতসমূহ অস্বীকার করা : তাওহীদুল আসমা ওয়াস সিফাত বা আল্লাহর নাম ও গুণাবলিতে একত্ব, আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব, মহত্ত্ব ও সৌন্দর্য যাবতীয় গুণাবলিতে এক, একক ও নিরঙ্কুশভাবে পূর্ণতার অধিকারী।
পবিত্র কুরআনে অন্যত্র বলা হয়েছে, ‘কোনো বস্তুই তাঁর সদৃশ নয়। তিনিই সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা’। (সূরা শুরা-১১)
অন্যত্র আছে, ‘তোমরা কি পরিবর্তন করতে চাও নিকৃষ্ট বস্তুকে উত্তম বস্তু দ্বারা’। (সূরা বাকারাহ-৬১)
৯. বিচারকাজে কুফরি মত অবলম্বন করা : আল্লাহ কেবল স্রষ্টাই নন, তিনি সৃষ্টিরাজি প্রতিপালনও করেন। অর্থাৎ কোনো কিছু সৃষ্টি করার পর আল্লাহ সেই সৃষ্টির ব্যাপারে নির্লিপ্ত থাকেন না, বা সেখান থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন না। বস্তুত বিশ্বজগতের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য এটা আবশ্যক। আল্লাহর বাণী সর্বকালের সর্বশ্রেণীর মানুষের কল্যাণের জন্য। আল্লাহর বিধানই সব েেত্র অনুসরণযোগ্য। আল্লাহর বিধান অনুযায়ী বিচারকাজ সম্পাদন করা মানুষের জন্য অপরিহার্য।
পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ‘তোমরা মানুষকে ভয় করো না, বরং আমাকে ভয় করো; আর আমার বিধানসমূহের বিনিময়ে (পার্থিব) সামান্য বস্তু গ্রহণ করো না; আর যে ব্যক্তি আল্লাহর অবতারিত (বিধান) অনুযায়ী হুকুম (বিচার) না করে, তাহলে এমন লোক তো পূর্ণ কাফের’। (সূরা মায়িদাহ- ৪৪)
১০. হারামকৃত বিষয়কে হালাল বা হালালকৃত বিষয়কে হারাম করা : মহান আল্লাহ যেসব বিষয়কে হারাম করেছেন তা চিরদিনই হারাম, আবার যা হালাল করেছেন তা কিয়ামত পর্যন্ত হালাল। কিন্তু তাবিল করে (বিকৃত ব্যাখ্যা) হারামকে হালাল বা হালালকে হারাম করার কোনো অধিকার মানুষকে দেয়া হয়নি। মহাজ্ঞানী আল্লাহ মানুষের জন্য কী প্রয়োজন তা তাঁর চেয়ে বেশি কারো জানা থাকার কথা নয়। তাই তাঁর আদেশ নিষেধ মান্য করা মানুষের অবশ্যই কর্তব্য। কিন্তু কোনো কোনো েেত্র কেউ কেউ বা কোনো কোনো বিশেষ শ্রেণীর ব্যক্তিবর্গের বিচণ (!) মতবাদ ঈমানকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

৩। ঈমান সুদৃঢ় রাখার কিছু উপায়ঃ
[১] অর্থ বুঝে কুর’আন তেলাওয়াত করুন। তেলাওয়াত করার সময় প্রতিটি আয়াতের মর্মার্থ উপলব্ধি করে সেগুলো নিয়ে চিন্তা ভাবনা করুন। দেখবেন হৃদয়ে আপনি এক অকৃত্রিম প্রশান্তি বোধ করবেন। হৃদয়ের কোমলতা বাড়বে। কুর’আন তেলাওয়াতের সময় মনে মনে কল্পনা করুন আপনি বিশ্ব জাহানের প্রতিপালক আল্লাহ্ রাব্বুল ‘আলামীনের সাথে কথা বলছেন। মনের ভিতর এমন ধরনের অনুভুতি সৃষ্টি করতে পারলে কুর’আন তেলাওয়াতের সর্বোত্তম সুফল অর্জন করা সম্ভব হবে। কুর’আন আল-কারীমে আল্লাহ্ রাব্বুল ‘আলামীন বিভিন্ন ধরনের মানুষের কথা বলেছেন। নিজেকে মিলিয়ে দেখুন আপনি কোন শ্রেনীর মানুষ।
[২] আল্লাহ্ রাব্বুল ‘আলামীনের মহত্ত্বকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করুন। বিশ্বচরাচরে যা কিছু আছে সবকিছুই তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন। আমরা চোখ খুলে যা কিছু দেখি সমস্ত কিছুর মাঝেই রয়েছে তাঁর নিদর্শন যা প্রতিনিয়ত তাঁরই মহীমা ও শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করে চলেছে; তাঁর হুকুম ছাড়া কোন কিছুই ঘটে না; তিনি সর্বদ্রষ্টা; কোন কিছুই তাঁর দৃষ্টি সীমার বাইরে নয়। গহীন অন্ধকার রাতে কালো পাথরের উপর কালো পিঁপড়াটিও নয়।
[৩] জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করুন। অন্তত প্রত্যাহিক জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়গলো সম্পর্কে আপনার জ্ঞান থাকা লাগবে। যেমনঃ সঠিক আকীদাহ, তাওহীদ, শিরকসম্পর্কে। সঠিক পদ্ধতিতে উত্তমরূপে নামায পড়া ও ওজু করতে জানা। আল্লাহ্ রাব্বুল ‘আলামীনের গুণবাচক নামগুলোর অর্থসহ সেগুলোর তাৎপর্য জানুন। কারণ আল্লাহ্ রাব্বুল ‘আলামীনকে তারাই বেশী ভয় করতে পারে যারা জ্ঞানী, যারা তাঁর সম্পর্কে জানে। এই জন্য আপনি এই বইটি পড়তে পারেন।
[৪] দ্বীনের আলোচনা হয় এমন বৈঠকে যোগদিন। কারণ আল্লাহ্ রাব্বুল ‘আলামীন সম্পর্কে আলোচনা হয় এমন অনুষ্ঠানে ফেরেশতারাও সমবেত হয়ে থাকেন। আমাদের ওয়েবসাইট থেকে লেকচার ডাউনলোড করে শুনতে পারেন এই লিংক থেকে।
[৫] বেশী বেশী সৎকর্ম করুন। একটি সৎকর্ম অন্যান্য সৎকর্মসমূহের দুয়ার খুলে দেয়। বেশী বেশী দান সাদাকাহ্ করুন। এমনটি করলে আল্লাহ্ রাব্বুল ‘আলামীন আপনার জীবনের চলার পথকে সহজ করে দেবেন। ফলে আপনি আরো বেশী সৎকর্ম সম্পাদনের জন্য উৎসাহ বোধ করবেন। সৎকর্ম সম্পাদন আপনার জন্য সহজ হয়ে উঠবে। সৎকর্ম সম্পাদনের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাঝে মাঝে অনেক ভাল কাজ করার চেয়ে অল্প অল্প করে প্রতিদিন কিছু না কিছু ভাল কাজ করা আল্লাহ্ রাব্বুল ‘আলামীনের কাছে বেশী পছন্দনীয়।
[৬] আপনার জীবনের চূড়ান্ত পরিণতি তথা মৃত্যু হতে পারে অত্যন্ত মর্মান্তিক। কাজেই প্রতিটি মুহূর্তে মৃত্যুকে ভয় করে পৃথিবীতে বেঁচে থাকুন। পার্থিব খেল-তামাশা থেকে বেঁচে থাকার জন্য বেশী বেশী মৃত্যুকে স্মরণ করুন।
[৭] আমাদের পরকালীন জীবনে বিভিন্ন ধাপ রয়েছে। পরকালীন জীবনের শুরু হয় মৃত্যু দিয়ে। এরপর কবরের জীবন, হাশরের ময়দানে বিচার, বিচার শেষে হয় জান্নাত না হয় জাহান্নাম। এছাড়াও রয়েছে পুলসিরাত। বিষয়গুলো নিয়ে ভাবুন। এমন পরকালীন ভাবনা আপনার ইহকালীন জীবনকে পরিশুদ্ধতা দান করবে। ফলে আপনার ঈমান সুদৃঢ় হবে।
[৮] প্রতিনিয়তই আল্লাহ্ রাব্বুল ‘আলামীনের সাহায্য প্রার্থনা করুন। বোঝার চেষ্টা করুন আমাদের অস্তিত্বের জন্য, আমাদের স্বার্থেই আল্লাহ্ রাব্বুল ‘আলামীনকে আমাদের প্রয়োজন। ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করা থেকে বিরত থাকুন। বিনয়ী জীবন যাপন করুন। জড়বাদী এই পৃথিবীর মোহে অন্ধ হয়ে যাওয়া থেকে বেঁচে থাকুন।
[৯] আল্লাহ্ রাব্বুল ‘আলামীনের দেয়া জীবন বিধান পালনের মাধ্যমে প্রমান করুন আপনি আপনার স্রষ্টাকে ভালবাসেন। তাঁর কাছে প্রার্থনার ক্ষেত্রে সর্বদায় আশাবাদী হউন। আশা করুন, আপনি যা চান তিনি তাই কবুল করবেন। তবে যে কোন সময় অপরাধ বা ভুল হয়ে যেতে পারে এই ভয়ে সদা সতর্ক ও ভীত থাকতে হবে। আত্ম-সমালোচনা করুন। সারাদিন কি করলেন তা পর্যালোচনা করে রাতে ঘুমানোর আগে কিছু সময় ব্যয় করুন।
[১০] উপলব্ধি করার চেষ্টা করুন, আল্লাহ্ রাব্বুল ‘আলামীনের বিধান অমান্য করে আমারা যে পাপ করি তার পরিণতি কি। আমাদের মন্দকর্মগুলো ঈমানকে দুর্বল করে দেয়। পক্ষান্তরে, সৎকর্মসমূহ আমাদের ঈমানকে সুদৃঢ় করে তোলে। এই বিশ্ব চরাচরে কোন কিছুই আল্লাহ্ রাব্বুল ‘আলামীনের ইচ্ছা ছাড়া সংঘটিত হয়না। আর আমাদের উপর যে বিপদ-আপদ আসে তা আমাদের নিজের হাতের কামাই ছাড়া কিছুই নয়। আমরা তাঁর অবাধ্য হয়ে নানান পাপে লিপ্ত হই যে পাপ আমাদের সকল দুর্দশার কারণ।
পরিশেষে, আল্লাহ্ রাব্বুল ইজ্জাত ওয়াল জালাল এর কাছে আমাদের এই প্রার্থনা, আমরা যেন ততক্ষণ পর্যন্ত মৃত্যুর কোলে ঢলে না পড়ি যতক্ষণ না আমরা তাঁর প্রিয় বান্দাহ্দের দলভুক্ত হতে পেরেছি। আল্লাহ্ আমাদের সকলের ঈমানকে আরো বাড়িয়ে দিন এবং আমাদেরকে তাঁর মনোনীত একমাত্র দ্বীন ইসলামকে মেনে চলার তাওফীক্ দিন।–আমীন।
৪ । দুর্বল ঈমানের কিছু লক্ষন হলঃ
আপনারা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করে থাকবেন, আমাদের ঈমান কখন বাড়ে আবার কখন কমে। এ সম্পর্কে রাসূল (সা) বলেন, “আমাদের প্রত্যেকের ঈমান ক্রমশ জীর্ণ হতে থাকে যেভাবে “সাউব” (এক ধরনের পোশাক) জীর্ণ হয়ে যায় (পোশাক ক্রমশ পরিধান করতে থাকলে যেমন একটা সময় জীর্ণ-শীর্ণ হয়ে যায়, আমাদের ঈমানও ঠিক তেমনি করে জীর্ণ হয়ে যায়)।” আর তাই প্রিয় নবী (সা:) এর উপদেশ হল, (যেহেতু আমাদের ঈমান জীর্ণ হয়ে যায়) “অতএব, প্রত্যেক মুসলমানের উচিত হৃদয়ে ঈমানের নবায়নের জন্য আল্লাহ্ রাব্বুল ‘আলামীনের কাছে দোয়া করা”।
[হাদীসটি আল-হাকিম তার “আল-মুসতাদ্রাক” গ্রন্থে, আল-হায়সামি তার “মাজ‘মা আল-যা‘ঈদ” গ্রন্থে, আল-তাবারানি তার “আল-কাবীর” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।] l.
(১) পাপ করা সত্ত্বেও মনে পাপবোধ সৃষ্টি না হওয়া।
(২) কোরআন তেলাওয়াতের ব্যপারে অনীহা এবং অনাগ্রহ বোধ করা।
(৩) ভাল কাজে আলসেমি বোধ হওয়া বা ঢিলেমি করা। যেমনঃ নির্ধারিত সময়ে সলাত আদায় না করা।
(৪) রাসূল (সা) এর সুন্নাহ্ অনুশীলনের ব্যপারে অবহেলা।
(৫) খামখেয়ালী মেজাজ। যেমনঃ সামান্য বিষয়েই তুলকালাম করে ফেলা বা মেজাজ সবসময় তিরিক্ষে বা খিটমিটে হয়ে থাকা।
(৬) কুরআনের তেলাওয়াত শুনে বিশেষ করে পাপের জন্য শাস্তি কিংবা সৎকাজের জন্য পুরুস্কারের কথা বলা হয়েছে এমন আয়াতগুলো শুনেও হৃদয়ে কোন রকমের কোন প্রভাব বা অনুভূতির তৈরি না হওয়া।
(৭) আল্লাহ্ রাব্বুল ‘আলামীনের স্মরণ থেকে বিমুখ হওয়া এবং তাঁকে স্মরণ করা কঠিন মনে হওয়া।
(৮) শারীয়াহ্ বিরুদ্ধ কার্যকলাপে লিপ্ত হওয়ার পরও মনে কোন অনুশোচনা বা অনুতাপ বোধ না হওয়া।
(৯) ধন-সম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি, সামাজিক অবস্থান ইত্যাদি এসব কিছুর পিছনেই সারাক্ষন ছুটে চলা।
(১০) ক্রমাগত মানসিক দৈন্যতার পাশাপাশি আর্থিক কৃপণতা বাড়তে থাকা। ধনসম্পদ আঁকড়ে ধরে রাখার প্রবনতা।
(১১) নিজে না করে অন্যকে ভাল কাজের আদেশ দেওয়া।
(১২) অন্যের অবনতি, ক্ষয়-ক্ষতি দেখে মানসিক তৃপ্তি বোধ হওয়া।
(১৩) শুধু হারাম ও হালালকেই মুখ্য মনে করা অথচ যেসব বিষয় মাকরুহ্ (খুবই অপছন্দনীয়) সেগুলোর দিকে ভ্রূক্ষেপ না করা।
(১৪) কেউ কোন ভাল (ছোট) কাজ করলে তা নিয়ে হাসাহাসি করা। যেমনঃ কেউ হয়ত মসজিদ ঝাড়ু দিল যা অবশ্যই ভাল কাজ কিন্তু কাজটি ছোট বলে তাকে নিয়ে হাসি তামাশা করা।
(১৫) নিজে মুসলিম হয়ে অন্য মুসলিমদের কল্যাণসাধনের ব্যপারে কোনরূপ প্রচেষ্টা বা মাথাব্যথা না থাকা।
(১৬) ইসলামের তথা মুসলিমদের কল্যাণ এবং উন্নতি হয় এমন বিষয়ে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেয়া।
(১৭) বিপদে ধৈর্য ধারন করতে না পারা। যেমনঃ কেউ মারা গেলে উচ্চস্বরে বিলাপ করে, বুক চাপড়িয়ে কান্নাকাটি করা।
(১৮) কোন দলীল-প্রমান ছাড়াই কেবল তর্ক করতে ভাল লাগে তা-ই তর্ক করা।
(১৯) দুনিয়ার মোহে অন্ধ হয়ে যাওয়া। দুনিয়ার মোহে অন্ধ হওয়ার একটি লক্ষন হল পার্থিব কোন কিছুর ক্ষতি হলেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়া।
(২০) সবসময় নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকা। নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্যই শুধু বেঁচে থাকা। চরম আত্ন-কেন্দ্রিক জীবন যাপন করা।

সংকলনে
মুহাম্মদ শাহ জাহান কুতুবী
,শিক্ষক্,
আধুনগর ইসলামিয়া ফাযিল মাদ্রাসা
লোহাগাড়া চট্টগ্রাম ।

Check Also

কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের ২৫ ও ২৬ ডিসেম্বরের দুই দিনের আনুষ্ঠানিক করসেবা (মাটির ব্যাংক)

ঈদে মিলাদুন্নবী (স) করসেবা——————————————————— ২৫ ডিসেম্বর, ২০১৫ নবীজী (স)-এর অনুসৃত মেহনতের পথই সাফল্যের পথ আমরা ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *