Home / সম্পাদকীয় / কবি ও কলামিষ্ট / ইচ্ছাশক্তি ও কর্মগুণেই মানুষ বড় হয়-মো. আলী আশরাফ খান
লেখক: কবি, কলামিস্ট ও সমাজ গবেষক গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লা।

ইচ্ছাশক্তি ও কর্মগুণেই মানুষ বড় হয়-মো. আলী আশরাফ খান

আমরা মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠজীব। সৃষ্টিকর্তা আমাদেরকে এমন সব শক্তি দান করেছেন, যে শক্তি দিয়ে আমরা ইচ্ছে করলে অনেক অসাধ্যকেও সাধন করতে পারি-যা সৃষ্টিকর্ততা চান। কোন মানুষ যদি মনে করেন যে, এই কাজটি আমি সম্পাদন করবো, তার দ্বারা এটি করা সম্ভব। ইচ্ছাশক্তির কারণেই এটি এতটাই সহজ হয়ে যাবে যা সে কখনও কল্পনাও করেননি।

আমি প্রায়শই একটি কথা বলে থাকি, ‘পৃথিবীর সব মানুষই স্বপ্ন দেখেন কিন্তু স্বপ্নকে কিরূপে আলিঙ্গণ করতে হয় তা খুব কম সংখ্যক মানুষই জানেন। যারা জানেন তারাই সফল হন’। সফল মানুষ প্রথমে তার মনোদর্পণে স্বপ্নের বিষয়সমূহ চিত্রায়িত করেন। হৃদয়ে রঙতুলির কাল্পনিক স্পর্শে ফুটিয়ে তুলতে চান-যেমনটি তার মনকে বিমুগ্ধ করে। সত্য ও সুন্দরের ধারাবাহিক অনুশীলনের মধ্যদিয়ে একসময় সে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁঁছে যান। এককথায় স্বপ্নের শুরু থেকেই তিনি মনোস্থির করে নেন যে, কোন কাজটি তার করতে হবে এবং কেনো সে এ কাজটি করবেন। মেয়াদভিত্তিক পরিকল্পনা অতঃপর কর্মপথ ধরে সামনে এগিয়ে চললে তিনি সফল হবেন-হবেনই। যতক্ষণ না তার মনোবাঞ্ছনা পুর্ণ হয় সে ভুলেও অন্য কোন পথ অবলম্বণ করবেন না। কর্মপরিকল্পনা বারবার পরিবর্তন যে একজন মানুষকে কতটা পিছিয়ে দেয়-এটা তার জানা থাকা আবশ্যক। যত কষ্টই হোক, কাজ করে যাবেন নিরলসভাবে, সময়ের ব্যবহারেও বিন্দুমাত্র পিছপা হবেন না তিনি। সময় যে কতটা মূল্যবান মানুষের জন্য, তা তাকে বোঝ সক্ষম হতে হবে। আর এ চিন্তা মাথায় রাখলেই একজন মানুষ যে কাজই করুন না কেন, তাতে মনোপ্রাণ ঢেলে দেবেন উজাড় করে। দ্বিধা-সংশয়, দুর্ভাবনা কোনোটাই তিনি তার মনে স্থান দেবেন না। দ্বিধা-সংশয়, দুর্ভাবনা মানুষের মনের শক্তিকে যে দুর্বল করে দেয়-এটা তিনি অবশ্যই বুঝবেন। শুধু তাই নয়, সবরকম পশ্চাৎমুখী চিন্তা তাকে কখনও স্পর্শ করতে পারবে না।
সৃষ্টিশীল মানুষ কোনো কাজ করতে ইচ্ছা করলে, ভেবে নেবেন-বিশ্বাস করবেন, কৃতকার্য তিনি হবেন হবেন-ই। আর এ বিশ্বাস শতভাগ বদ্ধমূল হবে তার মস্তীস্কে। এরপর থেকেই পরিশ্রম শুরু করবেন। এক পর্যায়ে দেখা যাবে যে, সত্যি সত্যিই বিরাট একটি কাজের কাজ তিনি সম্পাদন করে ফেলছেন। যা থেকে ব্যক্তি-পরিবার, সমাজ, দেশ-জাতি ও বিশ্ববাসী বড় রকমের সুফল ভোগ করা শুরু করবেন এক সময়।
আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, প্রবল ইচ্ছাশক্তি-দৃঢ় মনোবল ও কর্মগুণ-ই মানুষকে অনায়াসে তার লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়। আর এমন দৃষ্টান্ত রয়েছে আমাদের সামনে ভুরি ভুরি। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ইচ্ছাশক্তির ফলে বেশ কয়েক বছর আগে অলিম্পিক গেমস্-এ সাঁতার প্রতিযোগিতায় এমন একজন ব্যক্তি অংশগ্রহণ করেছিলেন, যার দু’টি হাত-ই ছিল না! তার কোচ তাকে তোয়ালে দিয়ে বেঁধে রেখেছিল সুমিংপুলের রেলিংয়ে। বাঁশি বাজানোর সময়ে খুলে দেওয়া হয়েছিল বাঁধনটি। জয়-পরাজয় বড় কথা নয়। অলিম্পিক গেমস্-এ অংশগ্রহণ করা কিন্তু কম গৌরবের বিষয় নয়। তাও আবার দুই হাতবিহীন প্রতিযোগী! এই প্রতিযোগী ছোটকাল থেকেই স্বপ্ন দেখতেন, একদিন সে বড় সাঁতারু হবেন। তার প্রবল ইচ্ছাশক্তি-দৃঢ় মনোবল তাকে সাফল্যের স্বর্ণ শিখরে পৌঁছে দিয়েছে। আর একজন ‘মার্ক ইংলিশ’ নামে নিউজিল্যান্ডের অধিবাসী, যিনি কৃত্রিম পা নিয়ে জয় করেছেন মাউন্ড এভারেস্ট-এর মতো বিশ্বের সু-উচ্চ পর্বত শৃঙ্গকে। মার্ক ইংলিশ ২৪ বছর আগে পর্বত আরোহণ করতে গিয়ে দু’টি পা’ হারান। কিন্তু বিন্দুমাত্রও ইচ্ছা ও মনোবলের কমতি দেখা দেয়নি কখনও তার মাঝে। একের পর এক পর্বত চূড়ায় উঠে ‘ইংলিশ’ প্রমাণ করেন যে, প্রতিবন্ধীরাও এমন কিছু করতে পারেন-যা গৌরব ও সম্মান বয়ে আনে সামগ্রিক জীবনে। ১৯৮২ সালে ইংলিস নিউজিল্যান্ডের সর্বোচ্চ পর্বত-‘মাউন্ড কুক’-এ আরোহণ করতে গিয়ে তুষারে আটকা পড়ে তার পায়ের পাতা থেকে হাঁটু পর্যন্ত নষ্ট হয়ে যায়। কেটে ফেলতে হয় তার পা’ দু’টি। কিন্তু তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি এই কৃত্রিম পা’ নিয়েই ২০০৪ সালে তিব্বতের ৮ হাজার ২০১ মিটার উঁচু পর্বত মাউন্ড চোউর চুড়ায় পৌঁছে দেয় তাকে। আর এ অবিশ্বাস্য ঘটনাটি ঘটান ইংলিস (৪৭), ২০০৬ সালের মে মাসে। তিনি ৪০ দিনের কঠোর ও কঠিন পরিশ্রমের পর এই বিরল রেকর্ডটি সৃষ্টি করেন। যা ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ হয়। যা বিশ্ববাসীর জন্য হয়ে থাকলো উৎসাহ ও প্রেরণা সৃষ্টিকারী একমন্ত্রের মতো।
আমাদের পাশের দেশ ভারতের অতি সাধারণ নারী ‘পিটিং দিদির বিষয়টি হয়তো অনেকে জানেন। তিনি ছোটকাল থেকেই মনের গহীনে স্বপ্ন লালন করতেন-একদিন মানুষের সেবায় নিজেকে নিবেদিত করবেন; ঢেলে দেবেন নিজের সব কিছু, বিশেষ করে সাধারণ মানুষদের জন্য। যারা সব সময় বিত্তবানদের দ্বারা হয় নিগৃহীত-নিষ্পেষিত তাদের জন্য একটা কিছু করার প্রত্যয় ছিল তার। আর এই আকাঙ্খক্ষা বুকে ধারণ করেই সামনের দিকে অগ্রসর হন পিটিং দিদি। জীবিকা নির্বাহের জন্য পেশা হিসেবে এই দরিদ্র পরিবারের অতি সাধারণ পিটিং শুরু করেন চা-পাতা কুড়ানো। কিন্তু তার মনের সুপ্তবাসনা বারবার তাকে পীড়া দিত খেটে খাওয়া-স্বল্প আয়ের মানুষদের প্রতি মালিকদের বৈষম্যমূলক আচরণকে ঘিরে। তিনি নারী শ্রমিকদের বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে সহযোগীতা করতে লাগলেন। একদিন বাম ফ্রন্ট শীর্ষক একটি রাজনৈতিক দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয় বিধানসভার সদস্য পদে তাকে। আর অমনিই তিনি মনের শক্তি ও আত্মবিশ্বাসের ফলে জয়ের মুকুট পরে নেন সবাইকে অবাক করে! কিন্তু পিটিং দিদি বিধানসভার এই সম্মানিত পদে আসিন হয়েও তার সঙ্গী চা-পাতা কুড়ানিদের ছেড়ে যেতে চাননি অন্য কোথাও। তিনি কাজ করছেন তাদের সঙ্গেই এবং খুব সাদামাটা জীবন যাপন করেছেন। বৃটেনের এক সময়কার প্রধানমন্ত্রী জনমেজর’র একজন সাধারণ বীমা কর্মী ছিলেন। যিনি তার সততা ও কর্মদক্ষতার গুণে ৬ বছর ৫৪ দিন কনজারভেটিভ দলের হয়ে প্রধানমন্ত্রীত্ব করেন।
‘ক্রীতদাস’ বুধিয়ার নাম কম বেশি সকলেরই জানার কথা। কারণ ইন্টারনেটের যুগে যে কোনো সাধারণ খবরও পৌঁছে যায় নিমিসেই পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। বুধিয়া সাড়ে ৪ বছর বয়সে ৭ ঘন্টা ২ মিনিটে ৬৫ কি.মি. পথ পাড়ি দেয় দৌড়ে, যা বিশ্বে এই প্রথম। এই বিরল কৃতিত্বের অধিকারী-বুধিয়ার জন্ম ভারতের উড়িষ্যা রাজ্যে এক হত দরিদ্র পরিবারে। বয়স যখন দুই তখন বাবাকে হারায় বুধিয়া। মা সুকান্তি সিং ছোট ছোট চার সন্তান নিয়ে বিপাকে পড়ে যান। অন্যের বাড়িতে ঝি-চাকরের কাজ করেও চালাতে পারছিলেন না সন্তানদের নূন্যতম চাহিদা। ফলে সবচে’ কঠিন কাজটির সিদ্ধান্ত নিতে হয় সুকান্তি সিংকে। মাত্র ৮০০ রুপিতে আদরের বুধিয়াকে বিক্রি করে দেন তিনি। আসলে টাকা এখানে মুখ্য ছিল না, আসল বিষয়টি হলো-অন্যের কাছে ছেলে ভাল থাকবে, দু’বেলা দু’মুঠো ভাত পাবে; পাবে রোগ-বালাইয়ের চিকিৎসা। এই বুধিয়াই বিশ্বে সবচেয়ে কম বয়সী ম্যারাথন দৌড়বিদ হিসেবে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখান। যার বয়স ছিল তখন সাড়ে ৪ বছর। এই ‘বিস্ময় বালক’ ৭ ঘন্টা ২ মিনিটে টানা দৌঁড়ে ৬৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়। বুধিয়ার এই অবস্থানে আসার পেছনে রয়েছে তার উস্তাদ বিরাঞ্চি দাসের অবদান। কড়া মেজাজের এই জুডো প্রশিক্ষক অনুশীলন চলাকালে তার মাঠে অন্য কাউকে প্রবেশ করতে দিতেন না। একদিন অনুশীলন চলাকালে হঠাৎ ৩/৪ বছরের এক পুঁচকে ছোড়া মাঠে ঢুকে পড়ে। বিরাঞ্চি-এর শান্তি হিসেবে বুধিয়াকে পুরো মাঠটা একবার চক্কার দিতে বলেন। তিনি ভেবেছিলেন এতেই কাজ হয়ে যাবে ছেলেটির। ভুলেও এ দিকটায় আর পা বাড়াবে না কখনও। ঘন্টা পাঁচেক পর বিরাঞ্চি দাস মাঠে ফিরে এসে অপার বিস্ময়ে আবিষ্কার করলেন, পিচ্ছিটা তখনো মাঠে চক্করেই আছে। দীর্ঘক্ষণ দৌঁড়ানোর ফলে তার অবয়বে ক্লান্তির ছাঁপ ঠিকই ছিল, কিন্তু তখনো তার ভাষা বলে দিচ্ছিল আমাকে দৌঁড়াতে বলা হয়েছে, আমি দৌঁড়াব-ই। বিরাঞ্চি দাস পাকা জহুরি, তার সোনা চিনতে ভুল হবার কথা নয়। বুধিয়াকে নিয়ে শুরু করেন তিনি স্বপ্ন দেখার। ৮০০ টাকা জমা দিয়ে দাসত্বের হাত থেকে মুক্ত করেন তিনি বুধিয়াকে। অনুশীলনের মাধ্যমে তাকে বিশ্বের সেরা দৌঁড়বিদের সম্মানের মালা পরিয়ে দেন মাত্র সাড়ে ৪ বছর বয়সে। এমনি করে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অসংখ্য মানুষের বড় হওয়ার ঘটনা আমরা জানি। যারা কৃতিত্বের বিরল সম্মানে ভূষিত হয়েছেন প্রচ- ইচ্ছাশক্তি-দৃঢ় মনোবল ও আকাক্সক্ষার ফলেই।
আসলে সফল হওয়ার মূলে সঠিক কর্মপরিকল্পনাই নিহিত। যারা অনেক কাজ এক সঙ্গে করতে চান, তাদের কোনোটাই সু-সম্পাদন হয় না। সুতরাং একসঙ্গে অনেক কাজ করা এবং কাজ ঘনঘন পরিবর্তন করলে কোনো কাজেই সুফল পাওয়া যায় না। সুস্থচিন্তা ও একাগ্রতার ধারাবাহিক কর্মে যে কেউ কঠিন কাজটিকেও সহজে করে ফেলতে পারেন। একজন মানুষ অর্থনৈতিকভাবে বড় হলেই তাকে বড় বলা যায় না। বড় হওয়ার জন্য প্রয়োজন বড় কাজ করা। আর হুট করে মানুষ বড় কাজও করতে পারে না। তাকে ছোট ছোট কাজের মধ্যদিয়েই বড় কাজের সম্পাদন করতে হয়। তাকে ভাবতে হয়, যশ-খ্যাতির জন্য কাজ নয়, প্রয়োজনের জন্যই মানুষকে কাজ করতে হয়। পৃথিবীতে প্রত্যেক মানুষই কাজ করতে এসেছে। এখানে অহেতুক রঙ-তামাশা করে সময় নষ্ট করার মানে নিজেকে চরমভাবে ঠকানোর পাশাপাশি সমাজ-দেশ-জাতি সর্বোপরি বিশ্বকে ঠকানো। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, শ্রেষ্ঠজীব হিসেবে স্রষ্টা মানুষকে এ পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। অসীম সম্পদ, অফুরন্ত ঐশর্য-সৌন্দর্য মানুষের মাঝে বিদ্যামান। এ সম্পদকে হেলাফেলায় অহেতুক নষ্ট করে যারা, তারা আহ্ম্মক ছাড়া আর কিছুই নয়। উন্নত চিন্তাচর্চায়, উন্নত কর্মের ধারাবাহিকতায় আমাদের প্রত্যেককেই প্রমাণ করা উচৎ যে, আমরা মানুষই সেরা অন্যসব সৃষ্টি থেকে। প্রবল ইচ্ছাশক্তি-দৃঢ় মনোবল, সঠিক কর্ম পরিকল্পনার মধ্যদিয়ে ভাল কিছু সৃষ্টি করাই মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্যের অন্যতম। আসুন, আমরা আজই সংকল্প করি, সময় নষ্ট না করে কাজের কাজ করে নিজের জীবনকে বদলে দেবো এবং সাজাবো সৃষ্টিশীল মনোরম এক পরিবেশে। এতে করে আমরা নিজেরা যেমন লাভবান হবো তেমনি লাভবান হবে দেশ-জাতি তথা বিশ্ব।

লেখক: কবি, কলামিস্ট ও সমাজ গবেষক
গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লা।
তারিখ: ০২.১০. ২০১৫

Check Also

নৈতিক শিক্ষা ও বিদ্যালয়

বর্তমান সমাজের হাজারো সামাজিক সমস্যা (ইভটিজিং, মাদকাসক্ত, ধূমপান, লিঙ্গ-বৈষম্য, দূর্ণীতি, টেন্ডারবাজি ইত্যাদি) বিদ্যালয়ের সহশিক্ষা কার্যাবলীর ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *