Home / তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি / আমার দেখা যুক্তরাজ্যের বিদ্যালয়
Jpeg

আমার দেখা যুক্তরাজ্যের বিদ্যালয়

গত ০৬-০৬-২০১৫ তারিখে আমি ও প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আলাউদ্দিন ভূঁইয়া ব্রিটিশ কাউন্সিলের কানেক্টিং ক্লাশরুম প্রজেক্টের মাধ্যমে শিক্ষা ভ্রমনে যুক্তরাজ্য ঘুরে আসি। এই ভ্রমনে পরিচিত হই এক নতুন সংস্কৃতি আর সমাজ ব্যবস্থার। আর সেই অভিজ্ঞতার ভান্ডার থেকে স্কুল ভিজিটের কথা তুলে ধরার আমার এই ছোট্ট প্রয়াস

সকালে দেখি আমার স্কুল পার্টনার লরা লিন্ডা আমাদের নিউপোর্ট গেস্ট হাইজ এসে উপস্থিত। আমাদের আজ পার্টনার স্কুল ভিজিট করার কথা, সকালেই লরা লিন্ডার উপস্থিতি দেখে তাড়াতাড়ি স্কুলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলাম। আমি ও আমার প্রধান শিক্ষক লিন্ডার গাড়িতে উঠলাম। ক্লাশ শুরু হয় ৯টায়। আমরা রওয়ানা দিলাম সাতটায়। লিন্ডাকে প্রশ্ন করলাম, এত তাড়াতাড়ি আমরা কেন রওয়ানা দিলাম? লিন্ডা বলল, যদি ট্রফিক জ্যাম থাকে তাছাড়া স্কুলে যাইয়া আমাদের কিছু কাজ করতে হয়। আমি ও প্রধান শিক্ষক স্কুল গেইটে নাম তালিকাভুক্তি করে ভিতরে ডুকলাম। লরা লিন্ডা আমাদের দুজনকে দুটি ভিজিটর কার্ড দিলেন। আমরা গলায় ভিজিটর গলায় দিয়ে তাদের এসেম্লি কক্ষ পার হয়ে নোটিশ কক্ষে গেলাম। নোটিশ কক্ষে চার্স বাইন কমিউনিটি প্রাইমারি স্কুলের পার্টনার স্কুলের তালিকায় বাংলাদেশের বাতাকান্দি হাইস্কুল নাম দেখতে পেলাম। তাদের বোর্ডে আমাদের বিদ্যালয়ের তিনটি ছবি আছে একটি প্রধান শিক্ষক, একটি আমার ছবি আরেকটি আমাদের বিদ্যালয়ের ছবি। আমরা মুগ্ধ হয়ে নোটিশ বোর্ড দেখতে লাগলাম। একটু পরেই লরা লিন্ডা তার বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের কাউন্সিলের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমাদেরকে ইয়ার সিক্স ক্লাশের একটি ইসলাম ধর্মের ক্লাশ পর্যবেক্ষণ করতে বললেন। আমরা গভীর মনোযোগ সহকারে ক্লাশটি পর্যবেক্ষণ করলাম। ক্লাশটিতে রোজা ,সালাতের ও হালাল খাবার কথা সুন্দর ভাবে ছাত্রদের বুঝিয়েছে এবং দলীয় কাজ দিয়েছে। মুলুত রোজার উপর ক্লাশটি ছিল। আমার জানামতে চার্স বাইন কমিউনিটি প্রাইমারি স্কুলে কোন ইসলাম ধর্মের ছাত্র/ছাত্রী নাই। এমন কি কোন শিক্ষক বা স্টাফ ইসলাম ধর্মের নাই। তবুও এত চমৎকার ইসলাম ধর্মের ক্লাস, বিস্ময় হবার কথাই।

ইসলাম ধর্ম ক্লাশের পর আমরা গেলাম ইয়ার-ফোর ক্লাশের ইংরেজি ক্লাশে। ইংরেজি ক্লাশে একটি মিউজিক গান দিয়ে ক্লাশ শুরু হল এবং ৫-৬মিনিটের মিনি লেকচার দিল তারপর থেকে দলীয় কাজ, একক কাজ, কর্মপত্র তৈরি এবং সমাধান। কোন ধরনের আওয়াজ বা বিশৃঙ্গখলা দেখা দিলে শিক্ষক হাত তুলে ৫৪৩২১ বলার সাথে সাথে ক্লাশ একদম নিরবতা। আমাদেকে খাবারের মেনু জিজ্ঞাসা করায় আমি মাংস ও চিংড়ি ছাড়া যেকোন কিছুতেই আপত্তি নাই জানালাম। আমাকে মেনু দেখালো, আমি না বুঝেই একটাতে টিক দিলাম। দুপুরে খাবার খেলাম কোন মতে, কোন স্বাদ পেলাম না। খাবারের পর লরা লিন্ডা গার্ডেন ক্লাবের কাজ-কর্ম দেখাল। ছোট একটি ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে গড়া একটি বাগান। তারপর আবার আরেকটি ক্লাশ পর্যবেক্ষণ। প্রত্যেকটি ক্লশে বিভিন্ন রকম ডিজাইনে গড়া, বিভিন্ন রকম বোর্ড, হাতের কাজ, ছাত্র-ছাত্রীদের যার যার ড্র্যায়ার আছে তাদের জামা-কাপড় রাখার, বই রাখার জন্য ব্যবস্থাও আছে। শিক্ষকের বোর্ডটি কম্পিউটারে টাস স্ক্রিন বোর্ড। শিক্ষক টাস স্ক্রিনে একটি বিশেষ কলম বা আঙ্গুল দিয়ে লিখতে পারে এবং মুছতে পারে। আবার ইচ্ছে করলে ল্যাপটপে লিখেও স্ক্রিনে প্রর্দশন করতে পারে। পাশেই হোহাইট বোর্ডও আছে। ক্লশ-রুমটি অত্যান্ত মনোরোম। খাবার পানি ব্যাবস্থা প্রত্যেকটি কক্ষেই আছে।
স্কুল ভিজিট করার লরা লিন্ডা নিজেই আমাদেরকে নিউ পোর্ট গেস্ট হাইজে নামিয়ে দিয়ে গেল। নিউ পোর্ট গেস্ট হাইজে এসেই জানলাম মিটিং আছে,একটু বিশ্রামের সময় পেলাম না, সবার সাথে বের হলাম। মদে দোকানে মিটিং করতে ভাল লাগলেও খেতে ভাল লাগে না। রতন বশাক, পীযুষ মজুমদার ও জোতিষ রায়ের স্কুল পার্টনারা মিটিং উপস্থিত থাকে। শুধু খাবার ছাড়া বাকী সব ভালই লাগে। মিটিং শেষে নিউ পোর্ট গেস্ট হাইজে এসে ফেসবুকের ব্রিটিশ কাউন্সিল পেইজ ও বাতায়েনে একটু ক্লিক করি, তারপর ঘুমিয়ে পড়ি।
সকালে পীযুষ স্যার দরজা টোকা দিল। আমি বললাম, স্যার এত সকালে কোন বিশেষ কাজ আছে? পী্যুষ স্যার বলল, কোন কাজ নয়, আপনার পার্টনার এসেছে। মনে মনে আমার স্কুল পার্টনারকে গালি দিলাম। হেডস্যারকে পাশের রুমেই ডেকে প্রস্তুত হতে বললাম।আমরা প্রস্তুত হয়ে নিচে নেমে আসলাম। আমরা নাস্তা খেলাম আর লরা লিন্ডা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করল। নাস্তা শেষে আমরা লরা লিন্ডার গাড়িতে উঠলাম। গাড়িটি গতকালের চেয়ে আজ ভিন্ন রাস্তায় চলছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আমরা কী স্কুলে যাচ্ছি? লরা লিন্ডা বলল, জি স্কুলেই যাচ্ছি, তবে ভিন্ন রাস্তায়। আমরা চার্স বাইন স্কুলে পৌছায়ে আবার ডুকার নিয়ম-কানুন, রেজিস্টেশন করে, গলায় ভিজিটর কার্ড লাগিয়ে ভিতরে ডুকলাম। আজ ম্যাথ ক্লাশ ভিজিটিং করলাম। ক্লাশ পর্যবেক্ষণ করার সময় একটু একটু ঘুমিয়ে পড়ি। চোখের ঘুমের ভাব আসলে চোখে সান-গ্লাশ লাগালাম। আমি ক্লাশের ছবি তোলতে চাইলাম কিন্তু লরা লিন্ডা ছবি তুলতে নিষেধ করছে। এখানে বাচ্চাদের ছবি তোলা নিষেধ। ছেলে-মেয়েদের পিতা-মাতার অনুমতি ছাড়া ছবি অনলাইনে দেয়া গুরুতর অপরাধ। লরা লিন্ডা ছবির ব্যাপারে আমাকে কঠোরভাবে সাবধান করে দিয়েছ। আমদেরকে বেলা এগারটার দিকে জানাল, আমরা আজ একটি হাইস্কুলে যাব। শোয়া এগারটার দিকে আমরা “দ্যা গাইনসবার্গ একাডেমি”র উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। আমরা দ্যা গাইনবার্গ একাডেমিতে পৌছালে প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক আমাদেরকে অভ্যর্থনা জানাল। দ্যা গাইনসবার্গ একাডেমির (The Gainsborough Academy) ভিতরে ডুকার জন্য কমপিউটারে এন্ট্রি করতে হয়। কমপিউটারে এন্ট্রি করার পর আমার ছবি সহ ভিজিটর পাশ কার্ড বের হল। কার্ডটি বুকের উপরে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠানের প্রধানের সাথে সাথে ভিতরে ডুকলাম।(কার্ডটিতে লিখা ছিল 9 June 2015 11:27 am Mohammad Shahzman ইত্যাদি) ভিতরে আমাদেরকে আপ্যায়ন করলেন এবং বিদ্যালয়ের সম্পর্কে সামারি বললেন। তারপর নিজে আমাদেরকে সমগ্র একাডেমি দেখাল এবং সাথে সাথে বর্ণনা দিলেন। আমি একাডেমি প্রধানের পারমিশন নিয়ে কিছু ছবি তোলেছি। আমার কাছে অভুতপূর্ববর্ণনীয় মনে হল। সবটা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। খুব খুব সুন্দর এবংশিক্ষানীয় লাগলো। একাডেমি থেকে বিদায়ের সময় কিছু শিক্ষানীয় উপহার দিল। একাডেমি পরিদর্শণের পর আবার চার্স বাইন স্কুলে আসলাম। এবার কিন্তু দুপুরের ইন্ডিয়ান রান্না করা খাবার খেলাম। কিভাবে রান্না করলে? আমি লিন্ডা ও তার সহকর্মীকে জিজ্ঞাসা করলাম। আমাদের প্রধান শিক্ষক জনাব আলাউদ্দিন ভূইয়া এবং ইন্টারনেট থেকে রেসিপির তথ্য সংগ্রহ করে আমাদের জন্য তারা রান্না করেছে। আমি বুঝতে পারলাম, আমাদের জন্য খুব কষ্ট করেছে।এখানে সকল ছেলে মেয়েদের দুপুরের খাবার দেয়া হয়। খারাবের পর বাচ্চাদের একটি ক্লাশ পর্যবেক্ষণ করলাম। তারপর একটি নাচের ক্লাশ দেখলাম। নাচের ক্লাশটি আমার কাছে খুব চমৎকার মনে হল। নাচের শিক্ষকটি অল্প বয়সের মেয়ে। অল্প বয়সের শিক্ষকের সাথে কঁচি কচিঁ শিক্ষার্থী খুব চমৎকার মানিয়েছে। বিকেল পাচঁটার পর আমাদেকে মিস্টার গাফ নামের শিক্ষক আমাদেকে গেস্ট হাইজে নামিয়ে দিয়ে গেল। বিকেলে জোতিষ স্যারের পার্টনার আমাদেরকে ডিনার বা বিকেলের খাবারের আমন্ত্রন জানিয়েছে।
১১ই জুন প্রধান শিক্ষক স্কুল ভিজিটে যাবে না। রাতে আমার ল্যাপটপ প্রধান শিক্ষককে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে শেভ (দাড়ি কাটাঁ) করলাম। গোসল করে নিচে নেমে এসে মিস্টার মাইককে বললাম ২টি ডিম আর পাউরুটি ভেজে (গরম) দিতে। এমন সময় আমার স্কুল পার্টনার লরা লিন্ডা এসে উপস্থিত। খাবারের পর লরা লিন্ডা সাথে আমি গাড়িতে উঠলাম। আজ গাড়িতে কিছু ব্যক্তিগত আলাপ হল। আমার ছেলে মেয়ে আছে কি না? আমি শিক্ষকতায় কত দিন ধরে আছি? আমার কেমন লাগে? ইত্যাদি। আজ বিদ্যালয়ের ছেলে-মেয়েদেরকে আমি ক্রিকেট খেলা শিক্ষাব। আমি আজ বাচ্চাদের সাথে একাবারে মিশে গেছি। আমাকে হাজারো রকমের প্রশ্ন করল বাচ্চারা। আমি হলাম সেরা ক্রিকেট কোচার। বাস্তবে লাড্ডু। গোজা মিল দিয়ে ক্রিকেট চালিয়ে গেলাম। ভাল করেছি। এগারটার দিকে একটি সরকারি হাইস্কুলে গেলাম। এই উচ্চ বিদ্যালয়টির নাম কুইন এলিজাবেথ গ্রামার স্কুল। এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৫৮৯ সালে। খুব পুরাতন স্কুল। প্রায় ১২০০ ছাত্র-ছাত্রী এখানে অধ্যয়ন করে। এই প্রতিষ্ঠানটি আরো উন্নত । এখানে রান্নার প্রতিযোগিতা, খেলাধুলার প্রতিযোগিতা হয়। বিশাল একটি লাইব্রেরি আছে। লাইব্রেরিতে আমাদের ইসলাম ধর্মের বই আছে। আছে ই-বুকের সিস্টেম। খেলাধুলার আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও আছে। পড়ার কক্ষ, পরিক্ষার কক্ষ,শ্রেণি কক্ষ ইত্যাদি কক্ষের অভাব নাই। লিফট ছাড়াও প্রতিবন্ধি শিক্ষার্থীদের দোতলা বা তিনতলায় উঠার জন্য সিড়িঁর পাশা-পাশি আছে বিশেষ ব্যবস্থা।
কোন ক্লাশই ত্রিশজনের বেশি ছাত্র-ছাত্রী দেখি নাই। আমাদের লেকচার ম্যাথডের পরিবর্তে আমি ক্লাশে এক্ট্রিভিটিজ বেশি দেখেছি।আমি এখানে প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রীদের নোট-প্যাড ব্যবহার করতে দেখেছি। বিশেষ করে ইংরেজি ও গনিতে নোট প্যাডের চমৎকার ব্যবহার দেখেছি। গেইমের ছলে বাচ্চার যোগ বিয়োগ,গুন ও ভাগ শিখছে। গনিতের চমৎকার চমৎকার গেইম দেখলাম। ইংরেজি প্রোনাউন্সিয়েশন, শব্দার্থ, বাক্য ইত্যাদির গেইম ও গান নোট-প্যাডের লক্ষ্য করলাম। সবার নিজস্ব আইডি ও পাসওয়ার্ড দিয়ে নোট-প্যাডে ঢুকে এবং শিক্ষক তার নিজস্ব আইডি ও পাসওয়ার্ড দিয়ে প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রীদের পর্যবেক্ষণ ও উন্নতি লক্ষ্য করে। অনলাইন পত্রিকায় জানলাম, আগামী বছর বাংলাদেশে ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রীদেরকে নোট-প্যাড দিবে। জানি না কোন ফরমুলায় এটা করছে। এটাতে কী শুধু পাঠ্য-পুস্তক না অন্যান্য শিক্ষামুলক বিনোদনের ব্যবস্থা আছে?
(চলবে…)
মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
আন্তর্জাতিক কো-অর্ডিনেটর (ব্রিটিশ কাউন্সিল)
বাতাকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়, তিতাস, কুমিল্লা।

Check Also

জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ-২০১৭ এ তিতাস উপজেলার শ্রেষ্ঠ শ্রেণি শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছে বাতাকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক শুভ

জেলা প্রতিনিধিঃ আজ তিতাস উপজেলার মিলনায়তনে জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ-২০১৭ এ তিতাস উপজেলার ফলাফল ঘোষণা করেণ ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *