Home / ইসলামী জীবন / আমলে সালেহ্ মানে কি? ঈমান ও আমলে সালেহ্ র সম্পর্ক এবং সাফল্য অর্জনের জন্যে আমলে সালেহ্ ভিত্তি হতে হবে ঈমান
মুহাম্মদ শাহ জাহান শিক্ষক আধুনগর ইসলামিয়া ফাযিল মাদরাসা লোহাগাড়া ,চট্টগ্রাম

আমলে সালেহ্ মানে কি? ঈমান ও আমলে সালেহ্ র সম্পর্ক এবং সাফল্য অর্জনের জন্যে আমলে সালেহ্ ভিত্তি হতে হবে ঈমান

আমলে সালেহ্ মানে কি?
মহান আল্লাহর বাণী থেকে একথা পরিষ্কার হয়ে গেলো, চিরক্ষতি ও ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া, জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়া, ক্ষমা লাভ, চিরন্তন সাফল্য ও জান্নাতের সৌভাগ্য অর্জন করা, পৃথিবীর প্রতিনিধিত্বের কর্তৃত্ব লাভ করা, দীন প্রতিষ্ঠিত করা এবং শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করার পূর্বশর্ত হলো ‘ঈমান ও আমলে সালেহ্’। কিন্তু প্রশ্ন হলো আমলে সালেহ্ মানে কি? কী এর মর্ম ও তাৎপর্য?

সাধারণত কুরআনের অনুবাদে আমলে সালেহ্র অর্থ করা হয়, ‘নেক আমল’ বা ‘ভালো কাজ’ বা ‘সৎ কাজ’। অবশ্য অনুবাদ তো আর ব্যাখ্যা বা তফসির নয়। তাই অনুবাদে এর চাইতে অধিক মর্ম প্রকাশ করাও সম্ভব নয়। কিন্তু আমলে সালেহ্র মর্ম ও তাৎপর্য এতোটুকুই নয়। কথাটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ এবং ব্যাপক অর্থবহ। উৎসুক পাঠকগণের উদ্দেশ্যে আমরা এখানে আমলে সালেহ্র আভিধানিক ও পারিভাষিক দিক থেকে যথার্থ মর্ম ও তাৎপর্য তুলে ধরতে চাই।
صَالِحٌ শব্দটি একবচন, এর বহুবচন صَالِحَاتٌ। এই صَالِحٌ শব্দটি উদ্গত হয়েছে صَلَحَ শব্দমূল (rootword) থেকে। বিখ্যাত আরবি ইংরেজি অভিধান ‘মুজাম আল লুগাহ আল আরাবিয়া আল মুয়াসিরাহ’ তে (by Milton Cowan) صَلَحَ শব্দের অর্থ লেখা হয়েছে নিম্নরূপ :
to be good, right , proper, in order, righteous, pious Godly. to be well, to be usable, practicable, suitable, appropriate. to be admissible, permissible. to be valid. to put in order, settle, adjust, make amends. to mend, improve, fix, repair. to make peace, become reconciled, make up. to poster peace (between), reconcile (among people). to make suitable, modify. to reform. to remove, remedy. to make arable, reclaim, cultivate. to further, promote, encourage. bring good luck. to agree, accept, adopt.
এই صَلَحَ থেকে গঠিত শব্দগুলোর অর্থ লেখা হয়েছে নিম্নরূপ:
صُلْحٌ (সুল্হ): Peace, settlement, composition, compromise, peace making.
صَلاَحٌ (সালাহ্): goodness, properness, rightness; practicability.
صَلاَحِيَّةٌ (সালাহিয়্যাহ): fitness, efficiency; practicability, proper, competence.
اِصْلاَحٌ (ইসলাহ): restoration, improvement, correction; adjustment, remedying, elimination, establishment of peace; compromise, peace making.
صَالِحٌ (সালেহ্) : good, right, proper, sound; through, substantial, out and out, solid, ; virtuous, pious, devout, goodly; usable, useful, practicable, serviceable, suitable, appropriate; fit for action.
আমরা জানি ‘আমল’ (عمل) মানে- কর্ম ও আচরণ। তাহলে ‘আমলে সালেহ’র মানে কী দাড়ায়? মূলত আমলে সালেহ্ মানে সেই সব কর্ম ও আচরণ যা صَلَحَ শব্দ মূলের অর্থের মধ্যে এবং صَلَحَ থেকে গঠিত শব্দ সমূহের মর্মের মধ্যে নিহিত রয়েছে। উপরে বর্ণিত আভিধানিক অর্থের আলোকে আমরা বলতে পারি, ‘আমলে সালেহ্’ মানে- সেইসব কর্ম ও আচরণ, যা ভালো, উত্তম, উৎকৃষ্ট, সৎ, সঠিক, যথার্থ, গ্রহণযোগ্য, আল্লাহ নির্দেশিত, সর্বজন স্বীকৃত ন্যায্য ও বাস্তব।
আমলে সালেহ্ মানে- শান্তি, শান্তি স্থাপন, সমঝোতা স্থাপন, মিলে মিশে চলা, নিষ্পত্তি করে নেয়া। মধ্যপন্থা অবলম্বন করা। সমঝোতা করে চলা, সন্ধি স্থাপন করা। মীমাংসা করে নেয়া। সংযমশীল হওয়া।
আমলে সালেহ্ মানে- যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা ও উপযুক্ততা অর্জন করা, যোগ্যতা ও দক্ষতা অর্জনের কাজ করা, নিজেকে যোগ্য, প্রয়োজনীয় ও উপযুক্ত বানানোর কাজ করা। ধারণ ক্ষমতা ও সক্ষমতা অর্জন করা।
আমলে সালেহ্ মানে সেইসব কাজ- যা উপকারী, সাহায্যকারী, কল্যাণকর, উন্নতিদানকারী; যা সুবিধাদানকারী, ফলদায়ক, লাভজনক।
আমলে সালেহ্ অর্থ- সংস্কার, সংশোধন, পরিমার্জন, পুননির্মাণ, পুণর্বহাল, পুনর্মিলন, নিরাময়, খাদ পরিশোধন ও পরিশুদ্ধির কাজ করা।
আমলে সালেহ্ মানে- পরামর্শ করে কাজ করা, উপদেশ গ্রহণ করা, স্বীকৃত পন্থায় কাজ করা।
আমলে সালেহ্ মানে- ভদ্র, সৌজন্য মূলক এবং সুন্দর ও চমৎকার আচরণ করা।
ঈমান ও আমলে সালেহ্’র সম্পর্ক
ঈমানের সাথে আমলে সালেহ’র সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। এ দুটি বিষয়কে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। ইসলামি উম্মাহ’র শ্রেষ্ঠ ইমাম মুজতাহিদগণ একমত হয়েছেন যে, ঈমানের তিনটি অবিচ্ছেদ্য অংগ রয়েছে। সেগুলো : ১. আন্তরিক বিশ্বাস, ২. মৌখিক ঘোষণা এবং ৩. কর্মে বাস্তবায়ন বা সম্পাদন। এই তিনটির সমন্বিত রূপই ঈমান। উদাহরণ স্বরূপ আল্লাহর প্রতি ঈমানের অর্থ হলো:
১. আল্লাহর অস্তিত্ব, এককত্ব, গুণাবলী, ক্ষমতা ও অধিকারের প্রতি বিশ্বাস।
২. এ বিশ্বাসের বিষয়ে মৌখিক ঘোষণা প্রদান করা এবং
৩. এ বিশ্বাসের ভিত্তিতে জীবন যাপন করা বা জীবনের সকল কর্ম সম্পাদন করা।
এই তিনটি বিভাগের সম্মিলিত ও সমন্বিত রূপই হলো ঈমান। সুতরাং ঈমানের মধ্যেই রয়েছে আমলে সালেহ্। অথবা কথাটা এভাবেও বলা যায় যে, আমলে সালেহ্ মূলত ঈমানেরই শাখা প্রশাখা।
যেমন একটি উৎকৃষ্ট জাতের গাছ। এ গাছটির সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত রয়েছে :
১. সেই বীজ, যা থেকে গাছটি উৎপন্ন হয়েছে,
২. গাছটির শেকড়,
৩. গাছটির কান্ড,
৪. গাছটির ডাল-শাখা-প্রশাখা,
৫. গাছটির ফুল ও ফল।
আল্লাহর রসূল সা. বলেছেন: ঈমানের রয়েছে ষাটের (সহীহ বুখারি) কিছু অধিক বা সত্তরের (সহীহ মুসলিম) কিছু অধিক শাখা। এর মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই’-এই ঘোষণা দেয়া। ছোট হলো, জনপথ থেকে ক্ষতিকর জিনিস অপসারণ করা। লজ্জাশীলতাও ঈমানের একটি শাখা।”
এ হাদিসের ভিত্তিতে শাহ অলি উল্লাহ দেহলভী রহ. বলেছেন, ‘প্রতিটি ভালো কাজই ঈমানের অংগ।’

সাফল্য অর্জনের জন্যে আমলে সালেহ্ ভিত্তি হতে হবে ঈমান
ঈমান বিহীন আমলে সালেহ্ নিষ্ফল। প্রকৃত পক্ষে ঈমান বিহীন আমল বা কাজকে আমলে সালেহ্ বলা যায়না। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের আমল বা কর্ম ও আচরণ আট প্রকার :
১. সর্ব স্বীকৃত মন্দ ও নিন্দনীয় কাজ।
২. জঘন্য দুষ্কর্ম ও অপরাধ মূলক কাজ।
৩. মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ সা.-এর মাধ্যমে প্রদত্ত আল্লাহর শরিয়ায় অপছন্দনীয় কাজ।
৪. আল্লাহ প্রদত্ত শরিয়ায় নিষিদ্ধ কাজ।
৫. সর্বস্বীকৃত ভালো ও প্রশংসনীয় কাজ।
৬. সর্বোৎকৃষ্ট ও কল্যাণময় কাজ।
৭. মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ সা.-এর মাধ্যমে প্রদত্ত আল্লাহর শরিয়ায় পছন্দনীয় কাজ।
৮. আল্লাহ প্রদত্ত শরিয়ায় বিধিবদ্ধ ও নির্দেশিত কাজ।
শেষোক্ত চার প্রকারের কাজই আমলে সালেহ্। আমলে সালেহ্ আল কুরআনের একটি পরিভাষা। তাই কুরআনের পরিভাষায় ঈমান-এর ভিত্তিতে বা ঈমান এনে অথবা মুমিন অবস্থায় এই চার প্রকারের কাজ করা হলে সেগুলো আমলে সালেহ্ হিসেবে গণ্য হবে। উল্লেখ্য, সর্বস্বীকৃত ভালো ও মন্দ কাজ ইসলামি শরিয়তেও ভালো এবং মন্দ কাজ হিসেবে অনুমোদিত।
উপরে صَلَحَ (সালাহা) থেকে উদ্গত সবগুলো শব্দের যেসব আভিধানিক অর্থ ও মর্ম উল্লেখ করা হয়েছে, ঈমানদার অবস্থায় বা ঈমানের ভিত্তিতে সে কাজগুলো করা হলে, সেগুলো সবই ‘আমলে সালেহ্’ বলে গণ্য হবে।
আমলে সালেহ’র জন্যে আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা এবং যেসব পুরস্কার ও শুভ প্রতিফলের ঘোষণা দেয়া হয়েছে, তা লাভ করবে কেবল তারাই, যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে এবং ঈমানের দাবি অনুযায়ী আমল করে। যারা আল্লাহ্র প্রতি ঈমান রাখেনা, আল্লাহর কাছে তাদের কোনো প্রাপ্য নেই। এ হচ্ছে অনেকটা নগরের পানি ও বিদ্যুত সরবরাহ কর্তৃপক্ষের মতো। যারা এসব কর্তৃপক্ষকে এবং তাদের নিয়মকানুন মেনে নিয়ে তাদের বিদ্যুত ও পানির লাইনের সাথে সংযোগ স্থাপন করবে, তারাই এদের সরবরাহকৃত বিদ্যুত ও পানি পাবে, অন্যরা পাবেনা।
মোট কথা, আমলে সালেহ’র ভিত্তি হলো ঈমান। ঈমান ছাড়া ভালো কাজের ফল লাভ করা যাবেনা। একটু আগেই আমরা আল কুরআনের যেসব আয়াত উল্লেখ করেছি, সেসব আয়াতে একথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ হয়েছে। আরো দুটি আয়াত দেখুন:
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً ۖ وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُم بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
অর্থ : ঈমান এনে যেকোনো পুরুষ বা নারী আমলে সালেহ্ করবে, আমি তাকে দান করবো উত্তম পবিত্র জীবন এবং তাদের পুরস্কার দেবো তাদের সবচেয়ে ভালো কাজগুলোর ভিত্তিতে। (সূরা ১৬ আন নহল : আয়াত ৯৭)
وَأَمَّا مَنْ آمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَهُ جَزَاءً الْحُسْنَىٰ ۖ وَسَنَقُولُ لَهُ مِنْ أَمْرِنَا يُسْرًا
অর্থ: তবে যে কেউ ঈমান আনবে এবং আমলে সালেহ্ করবে, তার জন্যে থাকবে সর্বোত্তম পুরস্কার এবং তার প্রতি আমার বিষয়গুলো বলবো সহজভাবে। (সূরা ১৮ আল কাহ্ফ : আয়াত ৮৮)
সংকলনে
মুহাম্মদ শাহ জাহান কুতুবী
শিক্ষক্,
আধুনগর ইসলামিয়া ফাযিল মাদ্রাসা
লোহাগাড়া , চট্টগ্রাম ।

Check Also

কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের ২৫ ও ২৬ ডিসেম্বরের দুই দিনের আনুষ্ঠানিক করসেবা (মাটির ব্যাংক)

ঈদে মিলাদুন্নবী (স) করসেবা——————————————————— ২৫ ডিসেম্বর, ২০১৫ নবীজী (স)-এর অনুসৃত মেহনতের পথই সাফল্যের পথ আমরা ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *